Saturday, 13 June 2020

ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় / নাকতলা , কলকাতা


সঙ্কল্পের সাথে বসে থাকা অনন্তকাল 


মুখার্জ্জীদের কাঁঠালতলার সিঁড়ি গুলো বিকেলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। সারাদিন এই বাড়ির মানুষেরা ও বাইরে থেকে আসা অতিথি অভ্যাগতদের হাঁটা চলায় সিঁড়িগুলোর সব হাড়গোড়ে প্রচন্ড ব্যথা হয়ে যেতো। বিকেলবেলায় কিন্ত চিত্র একেবারেই পালটে যেতো। এই বাড়ির ছোট থেকে বড়ো, নারী কিংবা পুরুষ, সব সদস্য সিঁড়ির সব কটা ধাপে এসে বসতো আড্ডা জমাতে। উপরের ধাপগুলো বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের জন্য। বয়স যতো কম, ততোই নীচের দিকের ধাপ বরাদ্দ হতো। রাম মুখার্জ্জীর বয়স তখন নব্বই পার। তিনি বলেছিলেন, "একটা এমন দিন ছিলো, আমার এখনো মনে আছে, আমি একদম তলার ধাপের নীচে প্রাঙ্গণের মেঝেতে বসতাম। আজ আমি একদম উপরের ধাপে। এ যেন স্বর্গারোহনের মানসিক প্রস্তুতির মতো। তুমি যতোদিন নীচের ধাপে থাকবে, ততোদিন জুটবে আদর আহ্লাদ। যতো উপরের ধাপে পৌঁছবে, ততোই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য কাঁধ চওড়া করতে হবে। একদম উপরের ধাপের কেউ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে, তাঁর মৃতদেহে নীচের ধাপের সদস্যদের কাঁধ দেওয়ার দায়িত্ব।"

ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জ্জনীর মাঝে রাখা নস্যি বারেবারে ঝাঁকাবেন, আর এই ধরনের কথা শেষ করেই এক বিকট চিৎকারে তাকে নাকে চালান করে দেবেন। নবদ্বীপের এই বাড়ির ছেলে সমীর মুখার্জ্জী ফুটবলে ডিস্ট্রিক্টে খেলে। প্রচুর সম্মান ওঁর ঝুলিতে। বাড়ির পিছনে বাঁশতলার মাঠে ফুটবল পিটিয়ে সে এসে যোগ দেয় আড্ডায়। তার আসামাত্রই প্রবীনতম সদস্য বলে ওঠেন, এই এসেছে দেখো ব্রাজিলের সমুরাল্ডো। এবার তোমরা কতো নাম শুনবে। তার সাথে কতো দেশের নাম। আচ্ছা সমুরান্ডো, ফুটবলের ব্যাসার্ধ কতো বাবা? নিপুণ উত্তরে ছোটদের তখন জানার ভান্ডার ভরে উঠতো। ইতিমধ্যে কোনদিন পাঁচটার আপ কাটোয়া লোকালে বাড়ি আসতেন কলকাতার বিখ্যাত বহুরূপী নাট্য সংস্থার বিশিষ্ট অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি। এই মুখার্জ্জী বাড়ির সে ভাগ্নে। তার আসামাত্র সবার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দের উত্তেজনা কাজ করতো। মামা বাড়ির সবার গর্ব এই ভাগ্নেকে নিয়ে। কেনই বা হবেনা! এই অমরের নাটক দেখতে কলকাতার নামিদামি থিয়েটার হলে রীতিমতো টিকিটের জন্য রাত থাকতে নাকি লাইন হয়। মারপিটও নাকি কখনোসখনো হয়। শম্ভু মিত্রের একান্ত স্নেহধন্য ও বিশ্বস্ত এই সৈন্য ওঁদের গর্ব তো হবেই। আইপিটিএ ছেড়ে শম্ভুবাবু যখন নাট্য দল "বহুরূপী" তৈরী করলেন, তখন এই ছেলেও তাঁর হাত ধরে বেড়িয়ে আসে আইপিটিএ ছেড়ে। অমর গাঙ্গুলির মুখে সবাই হাঁ করে শুনতো কলকাতার নাটক জগতের কতোই না অজানা কথা। আড্ডায় উঠে আসতো শম্ভুবাবু ও তৃপ্তি মিত্রর একমাত্র কন্যা ছোট্ট শাঁওলির অভিনয় দক্ষতার কথা। আড্ডায় জুড়ে যেতো তর্ক।

"বাবা-মায়ের ফলোয়ার হয়ে ছেলে বা মেয়ে নিজেকে তৈরী করে।" কেউ ছুঁড়ে দিলেন এহেন মন্তব্য। বিতর্কে অনেকেই এগিয়ে আসতেন। অমর গাঙ্গুলি সব্বাইকে থামিয়ে বলতেন, "এই তত্ত্বে আমার পূর্ণ সমর্থন নেই। তবে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়না। আংশিকভাবে কখনো এই তত্ত্ব ধোপে টিকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেলেনা। কারণ যে কোনো শিল্প হলো জন্মগত প্রতিভার সময়োচিত স্ফুটন। কারো ফোটে, কেউ বা হতভাগ্য। কিন্তু সুযোগ ও সময় একটা বড়ো ফ্যাক্টর।" আল্লা-খিল্লা-বিসমিল্লায় জমিয়ে আড্ডা জমে ওঠে।

সাঁঝবাতির সময় হয়। কেউ একজন নিয়ে আসে চায়ের বিরাট কেটলি ও প্রচুর কাঁচের গ্লাস। আরেকজন চট করে পারিবারিক দুর্গা মন্ডপে সন্ধ্যা দিতে ছুটে যায়। গানের ক্লাস থেকে এখনি এসে আড্ডায় যোগ দেবে এই বাড়ির ভাগ্নী শ্রীমতি কণকাঞ্জলী মুখার্জ্জী। বাবা-মায়ের সাধ করে রাখা নাম কোনোদিন নামের মাহাত্ম্যের মুখদর্শন করলোনা। আর করবেওনা। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কোঠায়।

বাঙালির আড্ডায় সবাই একসাথে জোটেনা, তবে একসাথে ওঠে। টাইম অ্যাডজাস্টমেন্ট সাঙ্ঘাতিক। কর্মক্ষেত্রে সময় নিয়ে বাঙালির বদনাম থাকলেও, আড্ডায় সকলের সময়ানুবর্তিতা চোখে পড়ার মতো। সবাই ঠাস ঠাস করে মশা মারতে শুরু করতে দিয়েছেন। কণকাঞ্জলী অর্থাৎ সবার প্রিয় কণক গান ধরলেন, "প্রথম আদি তব শক্তি…।" যতো সময় এগোবে ততোই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূর্চ্ছণা মুখরিত করবে মুখার্জ্জী বাড়ির প্রাঙ্গণ-দালান ছাড়িয়ে দন্ডপাণিতলার চৌহদ্দি। আসবেন নজরুল, ফিরোজা বেগম, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, জটিলেশ্বর, গীরিজাদেবী, আরো অনেকে। আড্ডা চলতে থাকে প্রতি বিকেলে একই ভাবে, ভিন্ন স্বাদে। আড্ডায় প্রবীণতম সদস্যটির নস্য সেবন, কারো কারো মিঠাপাতা পানের সুগন্ধ ছড়ানো আবেশ ও সকলের চা পান ছাড়া থাকতোনা আর কোনো নেশা দ্রব্যের এন্ট্রি পাশ। তার সাথে থাকতো খেলাধুলো, নাটক, গান, সাহিত্য নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও নতুন সৃষ্টির আনন্দ। কণকের গান শুনে ইদানিং কবিতায় নাম করা এই বাড়ির ছেলে বলে ওঠে, "তোমরা জানো, নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতের অধিকাংশ লিমেরিকে লেখা!" সকলে অবাক হয়ে একটা দ্বীপের নাম থেকে 'লিমেরিক' নামকরণ থেকে শুরু করে কবিতার একটি বিশেষ বিভাগ হয়ে লিমেরিক লেখার ব্যাকরণ হাঁ করে শোনে। সন্ধ্যা সাতটায় আড্ডায় পরিসমাপ্তি হতো বাড়ির মহিলাদের উদ্যোগে। তাঁদের তো যার যার রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য রাতের রান্না করতে হবে। এই বাড়িতে দু'বেলা একরকমের তরকারির চল নেই যে। গুরুগম্ভীর আড্ডায় ঠাঁই পায়না রন্ধন শিল্প। অথচ এঁদের হাতের গুণেই পুজোয় জমে যায় 'দুগ্গা ডালনা' নামে এক বিশেষ আইটেম। থাক তবে অন্দরমহলের কথা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এঁদের প্রতিভা নাহয় আড্ডার বাইরে থাক। নিভৃতচারিণী বাড়ির বৌমাদের রন্ধনের আড্ডা তোলা থাকে প্রতিদিন নারায়ণ পালার ভোগ রান্নার সময়টার জন্য।

কাঁঠালতলার সিঁড়িগুলো হাঁফ ছাড়ে। বাবার মাজায় ব্যথা হলে সন্তানেরা ঐ সময়কালে বাবার মাজা পাড়িয়ে দিতো দেওয়াল ধরে। বাবার ব্যথার সাময়িক অবসান হতো। এই সিঁড়িগুলোর একই অবস্থা। আড্ডা চলে বাঙালির ঘরে ঘরে, ক্লাবে, রেঁস্তোরায়, কফি হাউসে। আড্ডা কোথাও দেয় সৃষ্টির সন্দেশ, কোথাও বা অন্য কিছু। নদীয়া জেলার নবদ্বীপ শহরের এই মুখার্জ্জী বাড়ির আড্ডা গত শতকের ষাট থেকে নব্বই দশকের এক জীবন্ত দলিল।


ছবি - ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় (রবিকাশ্যপ )



























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

20 comments:

  1. ধন্যবাদ জানাই এই প্রচেষ্টাকে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনাকেও ধন্যবাদ লেখা পাঠানোর জন্য ।

      Delete
  2. ভালো লাগলো। চোখের সামনে বাড়িটা ভেসে উঠলো ভাস্কর দা।

    ReplyDelete
  3. মুখার্জী বাড়ির সুন্দর চিত্রায়ন । ভালো লাগল

    ReplyDelete
  4. অসাধারণ লাগলো। হঠাৎই যেন চলে গিয়েছিলাম আমার জন্মের বহু আগের সেই বিকাল গুলোতে। নিজেকে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম কাঁঠালতলার সর্বশেষ সিঁড়ির পর উঠোনে বসে চেনা এবং নামে-চেনা মানুষদের আসা-যাওয়া, শুনতে পাচ্ছিলাম তাদের কথা। আর তার সঙ্গে আরও তীব্র হয়ে উঠলো সেই বিকেলগুলোর অংশ না হতে পারার আক্ষেপ।

    ReplyDelete
  5. অসাধারণ লাগল ভাস্কর। স্বল্প পরিসরে বাঙালির আড্ডার বাস্তব চিত্র অসাধারণ মুন্সিয়িনায় ফুটিয়ে তুলেছ।

    ReplyDelete
  6. অসাধারণ লাগল ভাস্কর। স্বল্প পরিসরে বাঙালির আড্ডার বাস্তব চিত্র অসাধারণ মুন্সিয়িনায় ফুটিয়ে তুলেছ।

    প্রভাত রঞ্জন ভট্টাচার্য্য/কলকাতা।

    ReplyDelete
  7. খুব ভালো লাগল লেখাটি।

    ReplyDelete
  8. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  9. দুগ্গা ডালনার প্রতি কৌতুহল থেকে গেল।
    খুবই সুখপাঠ্য লেখা। মন ভালো করা।

    ReplyDelete
  10. Jibaner kichu muhrta hai pranjal..Jake ghire chale jibaner pran..ETA chlo Mukherjee barir pran krendo..jke ghre chle Mukherjee Bari.. sati khb bhlo. Smriti ghre lekha

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভালো থাকিস। আমার যাপনে সেঁটে আছে এই বাড়ির ঘ্রাণ।

      Delete
  11. ভাস্কো দা খুব ভালো লাগলো, সুন্দর চিত্রায়ন ।

    ReplyDelete