![]() |
| সেদিন ছিল , আজও আছে |
আড্ডা ।
এমন বাঙালি আছে যার আড্ডা দিতে ভালো লাগে না ? সত্যি বাঙালি যে বড় আড্ডা প্রিয়, তা আলাদা করে বলতে হয় না। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাঁচতারা হোটেল, বাঙালির আড্ডা সব জায়গাতেই চলে । আড্ডা দিতে বাঙালির কোনো ক্লান্তি নেই, নেই একঘেয়েমি । পৃথিবীর কোনো দেশের মানুষের সাথে বাঙালির আড্ডার তুলনা চলে না । বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়
" বাঙালির আড্ডার মেজাজ নেই অন্য কোনো দেশে,কিংবা থাকলেও যথোচিত পরিবেশ নেই ।
অন্যান্য দেশের লোক বক্তৃতা দেয়,রসিকতা করে ,তর্ক চালায়, ফুর্তি করে রাত কাটায় কিন্তু আড্ডা দেয় না । আমাদের ঋতু গুলো যেমন কবিতা জাগায় তেমনই আড্ডা জন্মায় । আমাদের চৈত্র সন্ধ্যা, বর্ষার সন্ধ্যা, শরতের জ্যোৎস্না-চলা রাত্রি শীতের মধুর উজ্জ্বল সকাল সবই আড্ডার নীরব ঘন্টা বাজিয়ে যায় । কেউ শুনতে পায় কেউ পায় কেউ পায় না ।
বাঙালি সত্ত্বাকে আড্ডা ছাড়া কল্পনা করা যায় না । বাঙালি দেশে হোক বা বিদেশে , বিয়ের বাড়িতে হোক বা মৃতের বাড়িতে কোনো না কোনো ভাবে সে আড্ডায় মেতে যাবে । তবে আড্ডার বিষয় কী ? বাঙালির আড্ডা দেওয়ার জন্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজন হয় না । হিমালয় থেকে শুরূ করে ভুতের গল্প । যে কোনো বিষয় হতে পারে আবার আলোচনার ভেতর থেকে যে কোনো বিষয় বের হতে পারে ।সেই ভাবনা থেকে ছবিও করা যেতে পারে।এমনও ভেবেছেন পরিচালক 'দেবায়ুশ চৌধুরী' । কলকাতা শহরে খাওয়ার ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে "রসগোল্লা" সিনেমা ।
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'দুরন্ত আশা' কবিতায় আড্ডা প্রিয় বাঙালি জাতিকে অন্যভাবে ব্যক্ত করেছেন । তিনি বাঙালি জাতিকে অলস ,বাকচতুর,অকর্মণ্য বলে উল্লেখ করেছেন ।তক্তপোশে জনাদশে'ক বসে আড্ডা দেওয়া কবির কাছে অসহ্য । শিষ্ট,শান্ত গৃহগত প্রাণ বাঙালিদের কবি ব্যঙ্গের চিবুকে জর্জরিত করেছেন । এই বাঙালিদের কবি যে ছবি এঁকেছেন তা এই রকম -
"তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু
নিদ্রা রসে ভরা,
মাথায় ছোট বহরে বড়ো
বাঙালি সন্তান ।”
তাই কবি বাঙালি জাতিকে আরব দেশের দুঃসাহসী বেদুইন হতে বলেছেন । বেদুইন জাতি যেমন বিপদকে ভয় পায়না,বালুচর মরুভূমি এবং বুকের মধ্যে উওপ্ত আগুন,দুরন্ত মরুপথ তাদের অবরোধ করতে পারে না । তেমনই হতে বলেছেন কবি বাঙালি জাতিকে ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আড্ডার সমালোচনা করেছেন বটে তবে আড্ডার মাধ্যমে জ্ঞান ,বিজ্ঞানের কথা থেকে শুরু করে ট্রেভেল স্টরি,এ্যাডভেঞ্চার, রোমান্স, ধর্ম,রাজনীতি, সমসাময়িক প্রসঙ্গ,সমাজ, শিল্প এই সবকিছু থেকেই সাহিত্যে উপাদান উঠে আসে । সিরিয়াস বা হালকা সকল বিষয়ই আলোচিত হয় আড্ডার আসরে । আড্ডা চলাকালীন কেউ কেউ সিরিয়াস কথাকে হালকা ভাবে রসিয়ে রসিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলে উপস্থাপন করেন । তবে বাঙালির আড্ডা যে সবসময় নির্ভেজাল এবং নির্মল থাকে, তেমনটি কিন্তু নয় । আড্ডা দিতে গিয়ে এবং আড্ডায় রঙ্গ তামাসা করতে গিয়ে বাঙালি অহরহ ঝামেলার মধ্যেও পড়ে । অনেক সময় জোক করতে গিয়েও অনেক আড্ডাবাজ নিজের অজান্তেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের মনকষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায় । এছাড়া বিশেষ করে ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে অহরহ বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয় এমন অবস্থায় উওপ্ত বাক্য বিনিময়,কথা কাকাকাটি ,ঝগড়া ফ্যাসাদ এমনকি গালাগালি, হাতাহাতি মারামারি ও হতে পারে ।
তবে সময়ের পরিবর্তনে পাল্টে গেছে অনেক কিছুই ।আসলে সময় যখন পরিবর্তন হয় সঙ্গে সঙ্গে উপাচার গুলোরও পরিবর্তন হয় । আগে পাড়ায় পাপায় আড্ডা হতো,আড্ডা হতো ঘরে বসে, চায়ের দোকানে, কফি হাউসে এই প্রসঙ্গে মান্না দের "কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই " এই গানটি গুরুত্বপূর্ণ ।এখন সত্যিই কফি হাউসের আড্ডা নেই ।কেউ তেমন কফি হাউসে মুখোমুখি আড্ডা দিতে পছন্দ করে না । বিজ্ঞানের অগ্ৰগতির সাথে বাঙালির আড্ডায় এসেছে ভার্চুয়াল তথা ইন্টারনেট মাধ্যম । ব্লগ,ফেসবুক,ই-মেল সবোপরি 'চ্যাট' শব্দটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত । যে যেখানেই থাকুক না কেন ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে ঢুকে আত্মীয় পরিজনদের সাথে আড্ডায় মাতে তখন তার সময় কীভবে চলে যায় তা সে বুঝতেই পারে না । ভার্চুয়াল আড্ডার মাধ্যমে সবাই মুহুর্তের মধ্যেই দেশ থেকে দেশান্তরে,দূর-দূরান্তে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয় ।সব বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ।
কবি সাহ্যিতিকেরাও ভার্চুয়াল আড্ডায় নিয়মিত আড্ডা দেন । তাই পরিশেষে বলা যায় জীবকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে নিয়মিত আড্ডা হোক । পরিবারের সদস্যদের বন্ধন দৃঢ় করতে কমবেশি পারিবারিক আড্ডা হোক । ভালো মানুষের আড্ডা সমাজকে পরিশিলীত করে । তাই বাঙালিদের আড্ডা আব্যাহত রাখতে হবে। আড্ডার মাধ্যমে সাহিত্য-চর্চা, সংস্কৃতি-চর্চা, ইতিহাস-চর্চা ও মানবিক মুল্যবোধের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে । পরিশিলীত নির্মল আড্ডা আব্যাহত থাকলে হাজার বছরেও বাঙালি সমাজকে কোনো ভাবেই ঘুণে ধরবে না ।
![]() |
| ছবি - সম্পা সাহা |
সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )


No comments:
Post a Comment