Saturday, 13 June 2020

শৌর্যদীপ সান্যাল / উত্তরপাড়া , হুগলী

https://assets.roar.media/assets/E8gZ7lHzJJ1rmTbh_1.jpg
চলছে চলবে 


বাঙালি ও আড্ডা এ দুটি আসলে সমার্থক শব্দ। যে কোনো দেশে, যে কোনো সময়ে, যে কোনো অবস্থায়৷ কড়িবরগা বেয়ে রোদ এসে পরে বিছানায়। চোখ কচলাতে কচলাতে বাঙালি প্রস্তুতি নেয় রোজকার ইঁদুরদৌড়ের। স্কুলপড়ুয়া ঝালিয়ে নেয় মুখস্থ না হওয়া সন-তারিখ, সদ্য চাকুরীজীবি যুবক সযত্নে গুছিয়ে নেয় আগামী প্রজেক্টের ফাইলের তোড়া আর সবেমাত্র কলেজে ওঠা ছেলেটি আর একবার আয়নায় দেখে নেয় নতুন হেয়ারকাটের সাথে শার্ট ইন করবে না ছেড়ে রাখবে দমকা হাওয়ায়।  এই নানা স্তরের নানা গন্তব্যের কাটাকুটি হয় যে চৌমাথায় তার নাম আড্ডা। বাথরুমের কল থেকে ক্যাম্বিস বল, তিনতলার তিতলি থেকে ঘোষপাড়ার ইডলি, বাঙালি আড্ডা ছাড়া এমন বিশাল বিস্তৃত মুক্ত চরাচর বোধহয় গোটা দুনিয়ার আড্ডা ইতিহাসে বিরল। সে এক হইহই কান্ড। গমগমে নন্দন চত্বরে সন্ধে নামে। রাত আসে এসপ্ল্যানেড ছুঁয়ে। আড্ডাও ছুঁয়ে ফেলে ছাদের পাঁচিল। নেশা গাঢ় হয়। টাইমলাইনের চেয়েও দ্রুত পাল্টে যায় আড্ডা-টপিক। বাঙালি হার মানে না। শুধু মেঘ সরে চাঁদ আসে আকাশে। বনেদি বাড়ির বৈঠকখানা থেকে,  গলির রক হয়ে বাঙালির আড্ডা পৌছায় ভার্চুয়াল মিডিয়ায়।  আড্ডার ওয়ার্ড লিমিট ক্রস করে যায় তার সীমানা। দুপুরের রাজনৈতিক তরজায় মুখ ভার করে থাকা বান্ধবীর ঠোঁটে উঠে আসে সুমনের গান।  প্রেমিক খুঁজে পায় তারকোভস্কির স্থিরচিত্র। বৃষ্টি আসে। বয়েস বাড়ে। দাম বাড়ে জিনিসের।  ঘাম নামে গাল বেয়ে। ভুরু কুঁচকে যায়।   সাড়াশির মতো গলা আঁকড়ে ধরে সময়। আর দক্ষ ডুবুরির মতো সময়কে ডজ করে আড্ডা টিকে থাকে। আসলে আদান-প্রদান মানুষের অতি প্রাচীন অভ্যেস। ভাবের ঘরের গোপন কুঠুরির খবর যতক্ষন প্রিয় বন্ধু অব্দি পৌছাচ্ছে,  ততক্ষন স্বস্তি কই? কিম্বা কর্পোরেট প্রমোশনের সুখবর যতক্ষন না মাসিক টার্গেট ছুঁতে না  চোরা প্রতিদ্বন্দ্বীর গেলাসে বরফ না হচ্ছে ততক্ষন আর সুখ কোথায়৷ তাই সুখ-দুঃখ,  শান্তি-অশান্তি, লাভ-ক্ষতির জীবনকে ফুৎকারে কাউন্টার করে চলা যাপনের নীরব সাক্ষী থাকে আড্ডা। সাক্ষী থাকে চায়ের দোকান, কফিহাউস, ৮ বি, একাডেমি। পোড়ো চিলেকোঠায় আবার ঢুকে পড়ে সকালের রোদ্দুর। ঘুম ভাঙে বাঙালির।  প্রস্তুতি চলে হোমওয়ার্কের, প্রস্তুতি চলে প্রেসেন্টেশানের, রাস্তায় পা রাখে ফার্স্ট ইয়ার। আড্ডা জেগে থাকে,  লাইটহাউসের মতো; বাংলা ভাষার মতো।


ছবি - শৌর্যদীপ সান্যাল

























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় / নাকতলা , কলকাতা


সঙ্কল্পের সাথে বসে থাকা অনন্তকাল 


মুখার্জ্জীদের কাঁঠালতলার সিঁড়ি গুলো বিকেলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। সারাদিন এই বাড়ির মানুষেরা ও বাইরে থেকে আসা অতিথি অভ্যাগতদের হাঁটা চলায় সিঁড়িগুলোর সব হাড়গোড়ে প্রচন্ড ব্যথা হয়ে যেতো। বিকেলবেলায় কিন্ত চিত্র একেবারেই পালটে যেতো। এই বাড়ির ছোট থেকে বড়ো, নারী কিংবা পুরুষ, সব সদস্য সিঁড়ির সব কটা ধাপে এসে বসতো আড্ডা জমাতে। উপরের ধাপগুলো বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের জন্য। বয়স যতো কম, ততোই নীচের দিকের ধাপ বরাদ্দ হতো। রাম মুখার্জ্জীর বয়স তখন নব্বই পার। তিনি বলেছিলেন, "একটা এমন দিন ছিলো, আমার এখনো মনে আছে, আমি একদম তলার ধাপের নীচে প্রাঙ্গণের মেঝেতে বসতাম। আজ আমি একদম উপরের ধাপে। এ যেন স্বর্গারোহনের মানসিক প্রস্তুতির মতো। তুমি যতোদিন নীচের ধাপে থাকবে, ততোদিন জুটবে আদর আহ্লাদ। যতো উপরের ধাপে পৌঁছবে, ততোই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য কাঁধ চওড়া করতে হবে। একদম উপরের ধাপের কেউ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে, তাঁর মৃতদেহে নীচের ধাপের সদস্যদের কাঁধ দেওয়ার দায়িত্ব।"

ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জ্জনীর মাঝে রাখা নস্যি বারেবারে ঝাঁকাবেন, আর এই ধরনের কথা শেষ করেই এক বিকট চিৎকারে তাকে নাকে চালান করে দেবেন। নবদ্বীপের এই বাড়ির ছেলে সমীর মুখার্জ্জী ফুটবলে ডিস্ট্রিক্টে খেলে। প্রচুর সম্মান ওঁর ঝুলিতে। বাড়ির পিছনে বাঁশতলার মাঠে ফুটবল পিটিয়ে সে এসে যোগ দেয় আড্ডায়। তার আসামাত্রই প্রবীনতম সদস্য বলে ওঠেন, এই এসেছে দেখো ব্রাজিলের সমুরাল্ডো। এবার তোমরা কতো নাম শুনবে। তার সাথে কতো দেশের নাম। আচ্ছা সমুরান্ডো, ফুটবলের ব্যাসার্ধ কতো বাবা? নিপুণ উত্তরে ছোটদের তখন জানার ভান্ডার ভরে উঠতো। ইতিমধ্যে কোনদিন পাঁচটার আপ কাটোয়া লোকালে বাড়ি আসতেন কলকাতার বিখ্যাত বহুরূপী নাট্য সংস্থার বিশিষ্ট অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি। এই মুখার্জ্জী বাড়ির সে ভাগ্নে। তার আসামাত্র সবার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দের উত্তেজনা কাজ করতো। মামা বাড়ির সবার গর্ব এই ভাগ্নেকে নিয়ে। কেনই বা হবেনা! এই অমরের নাটক দেখতে কলকাতার নামিদামি থিয়েটার হলে রীতিমতো টিকিটের জন্য রাত থাকতে নাকি লাইন হয়। মারপিটও নাকি কখনোসখনো হয়। শম্ভু মিত্রের একান্ত স্নেহধন্য ও বিশ্বস্ত এই সৈন্য ওঁদের গর্ব তো হবেই। আইপিটিএ ছেড়ে শম্ভুবাবু যখন নাট্য দল "বহুরূপী" তৈরী করলেন, তখন এই ছেলেও তাঁর হাত ধরে বেড়িয়ে আসে আইপিটিএ ছেড়ে। অমর গাঙ্গুলির মুখে সবাই হাঁ করে শুনতো কলকাতার নাটক জগতের কতোই না অজানা কথা। আড্ডায় উঠে আসতো শম্ভুবাবু ও তৃপ্তি মিত্রর একমাত্র কন্যা ছোট্ট শাঁওলির অভিনয় দক্ষতার কথা। আড্ডায় জুড়ে যেতো তর্ক।

"বাবা-মায়ের ফলোয়ার হয়ে ছেলে বা মেয়ে নিজেকে তৈরী করে।" কেউ ছুঁড়ে দিলেন এহেন মন্তব্য। বিতর্কে অনেকেই এগিয়ে আসতেন। অমর গাঙ্গুলি সব্বাইকে থামিয়ে বলতেন, "এই তত্ত্বে আমার পূর্ণ সমর্থন নেই। তবে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়না। আংশিকভাবে কখনো এই তত্ত্ব ধোপে টিকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেলেনা। কারণ যে কোনো শিল্প হলো জন্মগত প্রতিভার সময়োচিত স্ফুটন। কারো ফোটে, কেউ বা হতভাগ্য। কিন্তু সুযোগ ও সময় একটা বড়ো ফ্যাক্টর।" আল্লা-খিল্লা-বিসমিল্লায় জমিয়ে আড্ডা জমে ওঠে।

সাঁঝবাতির সময় হয়। কেউ একজন নিয়ে আসে চায়ের বিরাট কেটলি ও প্রচুর কাঁচের গ্লাস। আরেকজন চট করে পারিবারিক দুর্গা মন্ডপে সন্ধ্যা দিতে ছুটে যায়। গানের ক্লাস থেকে এখনি এসে আড্ডায় যোগ দেবে এই বাড়ির ভাগ্নী শ্রীমতি কণকাঞ্জলী মুখার্জ্জী। বাবা-মায়ের সাধ করে রাখা নাম কোনোদিন নামের মাহাত্ম্যের মুখদর্শন করলোনা। আর করবেওনা। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কোঠায়।

বাঙালির আড্ডায় সবাই একসাথে জোটেনা, তবে একসাথে ওঠে। টাইম অ্যাডজাস্টমেন্ট সাঙ্ঘাতিক। কর্মক্ষেত্রে সময় নিয়ে বাঙালির বদনাম থাকলেও, আড্ডায় সকলের সময়ানুবর্তিতা চোখে পড়ার মতো। সবাই ঠাস ঠাস করে মশা মারতে শুরু করতে দিয়েছেন। কণকাঞ্জলী অর্থাৎ সবার প্রিয় কণক গান ধরলেন, "প্রথম আদি তব শক্তি…।" যতো সময় এগোবে ততোই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূর্চ্ছণা মুখরিত করবে মুখার্জ্জী বাড়ির প্রাঙ্গণ-দালান ছাড়িয়ে দন্ডপাণিতলার চৌহদ্দি। আসবেন নজরুল, ফিরোজা বেগম, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, জটিলেশ্বর, গীরিজাদেবী, আরো অনেকে। আড্ডা চলতে থাকে প্রতি বিকেলে একই ভাবে, ভিন্ন স্বাদে। আড্ডায় প্রবীণতম সদস্যটির নস্য সেবন, কারো কারো মিঠাপাতা পানের সুগন্ধ ছড়ানো আবেশ ও সকলের চা পান ছাড়া থাকতোনা আর কোনো নেশা দ্রব্যের এন্ট্রি পাশ। তার সাথে থাকতো খেলাধুলো, নাটক, গান, সাহিত্য নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও নতুন সৃষ্টির আনন্দ। কণকের গান শুনে ইদানিং কবিতায় নাম করা এই বাড়ির ছেলে বলে ওঠে, "তোমরা জানো, নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতের অধিকাংশ লিমেরিকে লেখা!" সকলে অবাক হয়ে একটা দ্বীপের নাম থেকে 'লিমেরিক' নামকরণ থেকে শুরু করে কবিতার একটি বিশেষ বিভাগ হয়ে লিমেরিক লেখার ব্যাকরণ হাঁ করে শোনে। সন্ধ্যা সাতটায় আড্ডায় পরিসমাপ্তি হতো বাড়ির মহিলাদের উদ্যোগে। তাঁদের তো যার যার রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য রাতের রান্না করতে হবে। এই বাড়িতে দু'বেলা একরকমের তরকারির চল নেই যে। গুরুগম্ভীর আড্ডায় ঠাঁই পায়না রন্ধন শিল্প। অথচ এঁদের হাতের গুণেই পুজোয় জমে যায় 'দুগ্গা ডালনা' নামে এক বিশেষ আইটেম। থাক তবে অন্দরমহলের কথা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এঁদের প্রতিভা নাহয় আড্ডার বাইরে থাক। নিভৃতচারিণী বাড়ির বৌমাদের রন্ধনের আড্ডা তোলা থাকে প্রতিদিন নারায়ণ পালার ভোগ রান্নার সময়টার জন্য।

কাঁঠালতলার সিঁড়িগুলো হাঁফ ছাড়ে। বাবার মাজায় ব্যথা হলে সন্তানেরা ঐ সময়কালে বাবার মাজা পাড়িয়ে দিতো দেওয়াল ধরে। বাবার ব্যথার সাময়িক অবসান হতো। এই সিঁড়িগুলোর একই অবস্থা। আড্ডা চলে বাঙালির ঘরে ঘরে, ক্লাবে, রেঁস্তোরায়, কফি হাউসে। আড্ডা কোথাও দেয় সৃষ্টির সন্দেশ, কোথাও বা অন্য কিছু। নদীয়া জেলার নবদ্বীপ শহরের এই মুখার্জ্জী বাড়ির আড্ডা গত শতকের ষাট থেকে নব্বই দশকের এক জীবন্ত দলিল।


ছবি - ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় (রবিকাশ্যপ )



























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

ময়ূখ হালদার / রানাঘাট, নদিয়া


ছবি সৌজন্যে -অরিজিৎ বাগচী
ম্ভবতঃ 'আড্ডা' শব্দটা এসেছে উর্দু থেকে। তবে এর একটা অদ্ভুত নিজস্বতা আছে। আড্ডার মতো 'আড্ডা' শব্দের কোনও বিকল্প আজও খুঁজে পাওয়া যায় না। কবি ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর কথায়, "আড্ডা জিনিসটা সর্বভারতীয় কিন্তু বাংলাদেশের সজল কোমল মাটিতেই তার পূর্ণ বিকাশ।" আর্থাৎ আড্ডা আর বাঙালি যেন "মেড ফর ইচ- আদার।" রাজযোটক!

বাঙালির কাছে আড্ডা রামধনুর মতো। ব্যস্ততার মেঘবৃষ্টির শেষে যাকে দেখা যায় পাড়ার চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে, ফাঁকা মাঠে কিম্বা বাড়িতে। আড্ডা কখনও সৃষ্টির আঁতুড়ঘর, কখনও বা খোলা জানলা- প্রাণখোলা উদ্দামতা। একজন নাট্যকর্মী হিসেবে এবং লেখালেখির সাথে যুক্ত থাকার কারণে আমার কাছে আড্ডা ব্যাপারটা ভীষণ পজেটিভ।

অনেকদিন আগে কোনও এক বৃষ্টিসন্ধ্যা। রাত আটটা বেজে গেছে। অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছে। পড়ে আছি মাত্র তিনজন। আমার মাথায় নতুন নাটকের প্লট। অঝোর বৃষ্টি, চা, সিগারেট আর ফোক নিয়ে জমে উঠেছে মৌতাত। সেই বৃষ্টিভেজা আড্ডা থেকে জন্ম হলো "ভোলাভাই" নামক চরিত্রের। নাটকে যার কোনও সংলাপ ছিল না। সে কথা বলতো শুধুই গানের মাধ্যমে। এরকম আরও কত লেখা, চরিত্র উঠে এসেছে আড্ডা থেকে।

মাঝখানে হঠাৎ ইংরেজি কেতায় বাংলা বলার চল শুরু হলো। সে একেবারে বীতিবিচ্ছিরি ব্যাপার। খোকনদা গাইছে,
"মায়াবনবিহারিনী হরিণী..." প্রথম অন্তরাটা ধরলো- "ঠ্যাক্ ঠ্যাক্ নিজমনে ডুরেইঠে..." বাকিটা বিস্ফোরণ! হাসতে হাসতে খুন হয়ে যাওয়া আর কী! তখন আমরা কাঠ-বেকার। নিজেদের সার্কাসটিক নাম দিয়েছিলাম "বঞ্চিত- বানচোত্!" সে উচ্চারণ আরও ভয়ংকর- "বন্শিত ব্যানশট!" কতজনের প্রেম এই আড্ডা থেকে পৌঁছে গেছে ছাদনাতলায়! তাছাড়া রাজনীতির কচকচানি তো আছেই।

আবার আড্ডাতে নিয়মিত উঠে আসেন শেক্সপিয়র, ক্যামু, কাফ্কা, ব্রেখ্ট, স্তানিস্লাভস্কি, সার্ত্র, দস্তএভ্স্কি, হাইডেগার, শেলি, কিটস, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, কমলকুমার, বিভূতিভূষণ, বিনয়, শক্তি, সুনীল, সন্দীপন আরও অনেকেই। সব মিলিয়ে আড্ডার একটা ইতিবাচক দিক আমরা আজও খুঁজে পাই। তবে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের দেখে সত্যিই খারাপ লাগে। নির্ভেজাল, গঠনমূলক আড্ডার স্বাদ এরা পেল না! বাইক, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর ভার্চুয়াল জগতেই এরা নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। জীবনের পেয়ালা খালিই থেকে গেল! আসলে আমাদের আর্থাৎ বাঙালি "আড্ডাবাজ"দের কাছে আড্ডা ছাড়া জীবন মানেই নুন ছাড়া তরকারি। আজ মনে হয়, মান্না দে-র গাওয়া গানটা কী ভীষণ প্রাসঙ্গিক- "কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই!"

ছবি - ময়ূখ হালদার
























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

মনোনীতা চক্রবর্তী , ইসলামপুর

অতীতে ছিল , আজও আছে 


বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এক বড় উদ্দীপনা শক্তি—বাঙালির আড্ডা’—বলেছেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রখ্যাত জার্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাস।তাঁর মতে—‘আড্ডা প্রতিভা বিকাশের সহায়ক’।



'সাহিত্যের সন্ধানে'-এর ব্লগ-এ এমন 'বাঙালির আড্ডা'-নিয়ে লেখার সুযোগ হাতছাড়া করি কেমন করে !

আমার মনে হয় এক চূড়ান্ত স্ট্রেস-রিলিভারের কাজ করে এই 'আড্ডা' শব্দটি নিজেই। একটা মজার কথা কী জানেন, আমি আমার সময়ে ক্যাসেট থেকে শুরু করে পেন-ড্রাইভ, ব্লু-টুথ, মেমরি-কার্ড ; অর্থাৎ এ্যাডভান্সড-টেকনোলজির প্রায় সবক'টি 'সময়'-কেই পেয়েছি। তাই যখন আমাকে এই 'আড্ডা'-নিয়ে লিখতে বসলাম , তখনই ক্যাসেটের ফিতে জড়ানোর ছবিটি কিন্তু ভেসে উঠলো! ভেসে উঠলো আরও কত-কী! এমন 'অতিমারী-সময়' যখন আমাদের গোগ্রাসে গিলছে; ঠিক এরকম একটা অস্থির-দমবন্ধ করা অবস্থায় লিখতে বসেছি শুধু 'আড্ডা'নয়; 'বাঙালির আড্ডা'-নিয়ে। ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছে ক্যাসেটের ফিতে...ক্রমশ নস্টালজিয়া ঘিরে ধরছে। হ্যাঁ, বাবার কথা, মায়ের কথা এবং আরও আরও। ধমনীতে আজও বাজে, বেজেই চলে 'কফি হাউজের সেই আড্ডাটা..'

   আসলে, সেই 'মহাভারত'-এর সময় থেকে 'আড্ডা' জমজমাট। মনে পড়ছে আপনাদের সৌতির কথা? আমি না, ব্যাসদেবের মহাভারত সে-কথাই বলে এসেছে। চায়ের দোকান থেকে 'আগোরা', শীতের দুপুরের সবুজ ঘাসে বিছোনো শতরঞ্চি...উদাসী ছাদ থেকে হেরিটেজ বাড়ির ধুলোমাখা সিঁড়ি ছুঁয়ে থাকা রক... রাঙা'দার দোকান থেকে আলবার্ট-হল কিংবা বাড়ির বৈঠক-খানা অথবা অফ-পিরিয়ড কিংবা ক্লাস শেষের শীতের দুপুর কাজ সেরে রোদ্দুর জড়ানো বেলা বা ক্যাফে 'দ্য ম্যাগো'...সব-সবখানে লেগে আছে আড্ডা; বাঙালির আড্ডা। খুব নিবিড়; খুব প্রাণের এই আড্ডা।

  খুব মনে পড়ছে ছোটোবেলার কথা! ওই তখন থেকেই এই 'আড্ডা'-শব্দটির সাথে আমার পরিচয়। হ্যাঁ, আমি ঘর থেকেই ঘরের বাইরের আড্ডায় বরং আসি। উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ। লাইনের ( রেললাইনের সরল রেখা দু'ভাগে ভাগ করেছে শহরটিকে) ওপারে বিবেকানন্দ মোড় পার করে আরও বেশ  কিছুটা এগিয়ে রাস্তার ডানদিকে 'রাঙা'দার' দোকান। আসলে, বাবার-মায়ের, তাঁদের বন্ধুদের 'রাঙা'দা', তাই ওঁকে 'জেঠু' বলাটাই দস্তুর হলেও, ডাকতাম ওই 'রাঙা'দা' বলেই। সবার উনি রাঙা'দা, আমারও। রাধারমণ জেঠু কী অবলীলায় এমনই সকলের বুকের খুব কাছে ছিলেন। টেইলারিং-শপ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন পার্বণে বাবা এবং তাঁর সব বন্ধুরা এবং তাঁদের পরিবারের ওটাই ছিল আড্ডা। সম-অসম অনেক বন্ধুত্ব উপভোগ করতাম, হয়তো আনমনেই! মনহীন ছিল না, সেই সময়টা! খুব ছোটো ছিলাম তো! জয়ন্ত কাকু যখন রায়পুর থেকে আসতেন, আমার জন্য কত ক্যাডবেরি আসতো। ওখানেই পেতাম।

 আর একটি সান্ধ্য-আড্ডার কথা বলি, পড়ার মাঝে হঠাৎ যখন আমার প্রিয় ভিডিও আংকল আসতেন আর বলতেন পার্থ ঘোষ আর গৌরী ঘোষের কর্ণকুন্তী  সংবাদ-এর ক্যাসেট চালাতে বলতেন; তখন আমি কিছুতেই এই কবিতাটি শেষ করতে দিতাম না। সবাই যখন আড্ডা-গল্পে মশগুল, তখন আমি বারবার রি-ওয়াইন্ড মোডে নিয়ে যেতাম, যাতে তিনি আরও কিছুক্ষণ বসেন আর তারচেয়েও বড়ো কথা যেটা, তা হল আমার পড়াটা যেন সেদিনের মতো ইতি হয়; ডাহা ফাঁকিবাজ হলে যা-হয় আর-কী! বারবার ধরা পড়তাম, আর বারবার সেই পুনরূপী ভুল...আসলে, ওদের বিভিন্ন বিষয়ের কথাবার্তা আসলে গোগ্রাসে গিলতাম! কিন্তু ওটাও যে একটা অনুচ্চারিত আড্ডা-ই ছিল; তা বোঝার বয়স হয়নি বা বলা ভালো ম্যাচিওরিটিই আসেনি! এরকমই অনেক কথা! আসলে, আড্ডা মানেই এক-একটা তীব্র সঞ্চয়! তুমুল বিনিময়। বাঙালির রোজের আড্ডাই কি শুধু?  সারাবছর ধরে চলে এই আড্ডা বৈশাখের প্রথম দিন থেকে সমস্ত বাঙালি পা-রেখে আড্ডার যাওয়ায়!

আড্ডার কথা বললেই সক্রেটিসকে মনে পড়ে। যতই হোক-না বিষয় 'বাঙালির আড্ডা'... যিনি আড্ডার ছলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন শিক্ষা, তাঁর দর্শন, জীবনবোধ। ক্লান্তিহীন এই পথ চলায় আড্ডাবাজরা চিরকালীন জয়ী! মেটাফিজিক্যাল দাবি নয়, আড্ডা এবং বাঙালি যেন 'আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে...' আসলে, সুরটাই আসল। অনুরণনটাই সব।

তবে একটা কথা কী, আড্ডা নির্মল ও নির্ভেজাল আনন্দের বিষয়। আড্ডা দিয়ে শুধু সময়ই কাটানো হয় না, আড্ডা থেকে অনেক সময় অনেক কিছু জানা যায়, শেখাও যায়। সহজ কথায় আড্ডা বলতে খোশ-গল্প, কথা-বার্তা, গপ্প-সপ্প ইত্যাদি বোঝায়। আড্ডা সরাসরি কারো বিরুদ্ধে হয় না এবং আপাতঃ দৃষ্টিতে এতে কারো কোনো ক্ষতি হওয়ারও কথা নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা থেকে শুরু করে ভ্রমণ বর্ণনা, রোমাঞ্চ, প্রেম, দেশ, ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, চলচ্চিত্র, সমসাময়িক প্রসঙ্গ, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত এর যে কোনো কিছুই হতে পারে আড্ডার উপাদান। সিরিয়াস এবং হালকা বিষয় সবই আলোচিত হয় আড্ডার আসরে। কেউ কেউ আবার সিরিয়াস কথাকে হালকাভাবে রসিয়ে রসিয়ে আকর্ষণীয় করে আড্ডায় উপস্থাপন করতে পারে। এমনও লোক আছে যারা কৌতুক এবং চুটকি বলে আড্ডাকে জমিয়ে রাখে। বর্ষায় হোক বা শীতে বাঙালির একান্ত ঘরোয়া আড্ডায় মুড়িমাখা, সাথে সিঙারা বা রকমারি তেলেভাজাকে মধ্যমণি করে ঘিরে গোল হয়ে বসাও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাঙালির আড্ডা সব সময় যে নির্ভেজাল এবং নির্মল থাকে তেমনটি কিন্তু নয়। আড্ডা দিতে গিয়ে এবং আড্ডায় রঙ্গ-তামাশা করতে গিয়ে বাঙালি অহরহ ঝামেলার মধ্যেও পড়ে। অনেক সময় মজা করতে গিয়েও অনেক আড্ডাবাজ নিজের অজান্তেই বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ান এবং  দীর্ঘ দিনের খুব ভালো সম্পর্কতেও আঁচড় ধরে। এমনকি নষ্ট হয়েও যেতে পারে। এছাড়া বিশেষ করে ধর্ম এবং রাজনীতি বিষয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে অনেককে প্রায়ই বিড়ম্বনার মধ্যেও পড়তে দেখা যায়। এ রকম অবস্থায় উত্যক্ত হয়ে তির্যক-বাক্যালাপ ,

কথা কাটাকাটি,এমনকি গালাগালি, হাতাহাতি, মারামারিও ঘটে যাওয়ার দৃষ্টান্ত কম নয়। সেজন্য আড্ডার যেমন ভাল দিক আছে তেমনই আছে আড্ডার খারাপ দিকও।
  তারপরও, আড্ডার সদর্থক ভূমিকা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। বাঙালির প্রাণভোমরা।
গবেষণা বলছে, বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডাই আপনার জিয়নকাঠি।

লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকসের একটা রিপোর্ট বলছে, রোগ সারাতে আড্ডার জুড়ি নেই।  পারিবারিক আড্ডার চেয়ে বন্ধুমহলে আড্ডা অনেক ভাল। কারণ বন্ধুরাই পারে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিতে। মন ভাল থাকলে ভাল থাকবে শরীর। অতএব আপনার আড্ডা মারা নিয়ে ফ্যামিলি যতই গাঁইগুঁই করুক না কেন, ঠেকবাজি চালিয়ে যেতেই পারেন। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকসের সমীক্ষা রিপোর্টে এমনই দাবি। কীসের ভিত্তিতে এত বড় কথা বলছে তারা?

 তিন বছর ধরে স্মার্টফোনের ডাটা সংগ্রহ করে আড্ডার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেছে লন্ডনের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হ্যাপিনেস মাপতে তৈরি করা হয়েছে HAPPINESS APP। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই অ্যাপ অ্যালার্ট দিতে থাকে। জানতে চায় সময়ে সময়ে কে  কতটা সুখী? কতটা আরামে? মুড যখন ভাল, তখন তাঁরা কী করছেন এবং কাদের সঙ্গে রয়েছেন?

৫০ হাজার মানুষ HAPPINESS APP ডাউনলোড করেন। ৩০ লক্ষ উত্তর উঠে আসে তাঁদের কাছ থেকে। HAPPINESS APP এর সমীক্ষায় যা উঠে এসেছে, তা হল এই রকম,

মন ভাল করতে কে কত ভাল?

বন্ধুরা খুশি রাখতে পারে ৮.২ শতাংশ - সবচেয়ে বেশি। সেখানে জীবনসঙ্গী (স্বামী অথবা স্ত্রী) খুশি রাখতে পারে ৫.৯ শতাংশ। অন্যান্য পরিবার ২.৯ শতাংশ। সন্তান-সন্ততি তারও পেছনে - ১.৪ শতাংশ।  অর্থাত্‍ মুড ভাল করতে পরিবারের চেয়ে বন্ধুরাই বেশি চোস্ত।


স্ট্রেসফুল আর টেনশনে ঠাসা লাইফে মানুষ কার সান্নিধ্যে সবচেয়ে বেশি খুশি? এটাই দেখতে চেয়েছিলেন গবেষকরা। আর সেখানে ফ্যামিলিকে পিছনে ফেলে জিতে যাচ্ছে ফ্রেন্ডস।
 
   আপাতত; করোনা দিনে অনলাইন-আড্ডা... অথবা সত্তরের শুরুর দিকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজে কবি-সাহিত্যিকদের তুখোড় আড্ডা  অথবা কাচের গ্লাসের গায়ে বিন্দু-বিন্দু ঘাম নিয়ে প্রিয় কাছের কোনও বন্ধুর সাথে আড্ডা...সবটাই ওই 'বিউটি বোর্ডিং'-এর মতো.. হয়তো সোনালি বিকেলগুলো ততটা সোনালি নেই; হয়তো ১৯৭১এর ওপার বাংলা থেকে আসা কবি সাহিত্যিক থেকে শুরু করে প্রতিদিন ক্যান্টিনের চায়ের কাপের সাথে আড্ডার ঝড় তুলতেন নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শামসুর রাহমান, আল মা‏হমুদ, নির্মলেন্দু গুণ ও শামসুল হকের মতো প্রখ্যাত কবিরা। আরো আসতেন সমুদ্র গুপ্ত, ফজল শাহাবুদ্দিন, ফয়েজ আহমদ ও সন্তোষ গুপ্তের মতো সাংবাদিকরা। আসতেন কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায়ও। এছাড়াও সত্য সাহা, কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী, ভাস্কর নিতুন কুণ্ড, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির আড্ডার স্থান ছিল এই বিউটি বোর্ডিং। এ তো গেল ঢাকার কথা।

আর 'বুধ সন্ধ্যা', মনে পড়ে?  এপারের কোন লেখক-কবি-সাহিত্যিক নেই এতে! মূলত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সাগরময় দত্ত-র যৌথ উদ্যোগে এই আড্ডার লক্ষ্যেই 'বুধ সন্ধ্যা'...
এই আড্ডায় ছিলেন না কে? শঙ্খ ঘোষ, সুবোধ সরকার, মল্লিকা সেনগুপ্ত, জয় গোস্বামী, আবুল বাশার, আফসার আহমেদ, তারাপদ রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্দাক্রান্তা সেনের মতো বিখ্যাত সাহিত্যিকরা এ আড্ডার নিয়মিত সদস্য ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, অসীম সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, সৈয়দ আল ফারুক, তারিক সুজাতসহ বাংলাদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকের আনাগোনা ছিল এই আড্ডায়। প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে ; সত্যজিৎ রায়েরঅনবদ্য চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালি’র ভাবনাও এই আড্ডা থেকেই শুরু।

আমরা তাঁর 'আগন্তুক' ছবিতেও বাঙালির আড্ডা-যাপনকে পাই।
আড্ডা বাঙালি মননের একটা অনিবার্য-চাহিদা। বলা যায় এক নিবিড় আকুতি যা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে কী অনায়াসে!

যাইহোক, লেখাপড়া-র সুবাদে যে-সাহিত্য আড্ডার শুরুটা হয়েছিল কালিয়াগঞ্জের শ্রীমতি নদীপাড়ের সাহিত্য-আড্ডায়...তা আজ নিয়মিত ইসলামপুর রোববারের সাহিত্য আড্ডা থেকে চা-বাগানের রিসর্ট থেকে প্রবীর'দা-চিত্রা'দির আড্ডা; কালিনী,একমুঠো রোদ থেকে সেতু-সৃজনী-পর্যাস-অফিসার্স ক্লাব-আইসিডিএফ-উত্তরা-গোল্লাছুট ইচ্ছেবাড়ি হয়ে আড্ডাগলি হয়ে এখন ডুয়ার্স-এর মূর্তির পাড়ে...
শুনেছি, আড্ডাঘরের কথাও; যদিও যাবার সৌভাগ্য হয়নি এখনও!
পরিশেষে, এই আড্ডার ইতি টানি বুদ্ধদেব বসুর উচ্চারণ দিয়েই

"বাঙালির আড্ডার মেজাজ নেই অন্য কোনো দেশে, কিংবা থাকলেও যথোচিত পরিবেশ নেই। অন্যান্য দেশের লোক বক্তৃতা দেয়, রসিকতা করে, তর্ক চালায়, ফূর্তি করে রাত কাটিয়ে দেয়, কিন্তু আড্ডা দেয় না। আমাদের ঋতুগুলো যেমন কবিতা জাগায়, তেমনই আড্ডাও জমায়। আমাদের চৈত্রসন্ধ্যা, বর্ষার সন্ধ্যা, শরতের জ্যোৎস্না-ঢালা রাত্রি, শীতের মধুর উজ্জ্বল সকাল- সবই আড্ডার নীরব ঘণ্টা বাজিয়ে যায়, কেউ শুনতে পায়, কেউ পায় না।'

ঋণ-স্বীকার-
●সাহিত্যিক বুবুন চট্টোপাধ্যায়
●লীনা চাকী সম্পাদিত 'বাঙালির আড্ডা'
●কলকাতার আড্ডা-সমরেন্দ্র দাস সম্পাদিত।
◆অন্তর্জাল
ছবি - মনোনীতা চক্রবর্তী























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )


সম্পা সাহা / দক্ষিণ দিনাজপুর


বাঙালির আড্ডা :একটি আড্ডাবাজির বই
সেদিন ছিল , আজও আছে 

ড্ডা ।

এমন বাঙালি আছে যার আড্ডা দিতে ভালো লাগে না ? সত‍্যি বাঙালি যে বড় আড্ডা প্রিয়, তা আলাদা করে বলতে হয় না। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাঁচতারা হোটেল, বাঙালির আড্ডা সব জায়গাতেই চলে । আড্ডা দিতে বাঙালির কোনো ক্লান্তি নেই, নেই একঘেয়েমি । পৃথিবীর কোনো দেশের মানুষের সাথে বাঙালির আড্ডার তুলনা চলে না । বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়
" বাঙালির আড্ডার মেজাজ নেই অন্য কোনো দেশে,কিংবা থাকলেও যথোচিত পরিবেশ নেই ।

অন‍্যান‍্য দেশের লোক বক্তৃতা দেয়,রসিকতা করে ,তর্ক চালায়, ফুর্তি করে রাত কাটায় কিন্তু আড্ডা দেয় না । আমাদের ঋতু গুলো যেমন কবিতা জাগায় তেমনই আড্ডা জন্মায় । আমাদের চৈত্র সন্ধ‍্যা, বর্ষার সন্ধ‍্যা, শরতের জ‍্যোৎস্না-চলা রাত্রি শীতের মধুর উজ্জ্বল সকাল সবই আড্ডার নীরব ঘন্টা বাজিয়ে যায় । কেউ শুনতে পায় কেউ পায় কেউ পায় না ।

বাঙালি সত্ত্বাকে আড্ডা ছাড়া কল্পনা করা যায় না । বাঙালি দেশে হোক বা বিদেশে , বিয়ের বাড়িতে হোক বা মৃতের বাড়িতে কোনো না কোনো ভাবে সে আড্ডায় মেতে যাবে । তবে আড্ডার বিষয় কী ? বাঙালির আড্ডা দেওয়ার জন্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজন হয় না । হিমালয় থেকে শুরূ করে ভুতের গল্প । যে কোনো বিষয় হতে পারে আবার আলোচনার ভেতর থেকে যে কোনো বিষয় বের হতে পারে ।সেই ভাবনা থেকে ছবিও করা যেতে পারে।এমনও ভেবেছেন পরিচালক 'দেবায়ুশ চৌধুরী' । কলকাতা শহরে খাওয়ার ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে "রসগোল্লা" সিনেমা ।

তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'দুরন্ত আশা' কবিতায় আড্ডা প্রিয় বাঙালি জাতিকে অন্যভাবে ব্যক্ত করেছেন । তিনি বাঙালি জাতিকে অলস ,বাকচতুর,অকর্মণ্য বলে উল্লেখ করেছেন ‌।তক্তপোশে জনাদশে'ক বসে আড্ডা দেওয়া কবির কাছে অসহ‍্য । শিষ্ট,শান্ত গৃহগত প্রাণ বাঙালিদের কবি ব‍্যঙ্গের চিবুকে জর্জরিত করেছেন । এই বাঙালিদের কবি যে ছবি এঁকেছেন তা এই রকম -

   "তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু
   নিদ্রা রসে ভরা,
   মাথায় ছোট বহরে বড়ো
   বাঙালি সন্তান ।”

তাই কবি বাঙালি জাতিকে আরব দেশের দুঃসাহসী বেদুইন হতে বলেছেন । বেদুইন জাতি যেমন বিপদকে ভয় পায়না,বালুচর মরুভূমি এবং বুকের মধ্যে উওপ্ত আগুন,দুরন্ত মরুপথ তাদের অবরোধ করতে পারে না । তেমনই হতে বলেছেন কবি বাঙালি জাতিকে ।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আড্ডার সমালোচনা করেছেন বটে তবে আড্ডার মাধ্যমে জ্ঞান ,বিজ্ঞানের কথা থেকে শুরু করে ট্রেভেল স্টরি,এ্যাডভেঞ্চার, রোমান্স, ধর্ম,রাজনীতি, সমসাময়িক প্রসঙ্গ,সমাজ, শিল্প এই সবকিছু থেকেই সাহিত্যে উপাদান উঠে আসে । সিরিয়াস বা হালকা সকল বিষয়ই আলোচিত হয় আড্ডার আসরে । আড্ডা চলাকালীন কেউ কেউ সিরিয়াস কথাকে হালকা ভাবে রসিয়ে রসিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলে  উপস্থাপন করেন । তবে বাঙালির আড্ডা যে সবসময় নির্ভেজাল এবং নির্মল থাকে, তেমনটি কিন্তু নয় । আড্ডা দিতে গিয়ে এবং আড্ডায় রঙ্গ তামাসা করতে গিয়ে বাঙালি অহরহ ঝামেলার মধ্যেও পড়ে । অনেক সময় জোক করতে গিয়েও অনেক আড্ডাবাজ নিজের অজান্তেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের মনকষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায় । এছাড়া বিশেষ করে ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে অহরহ বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয় এমন অবস্থায় উওপ্ত বাক্য বিনিময়,কথা কাকাকাটি ,ঝগড়া ফ‍্যাসাদ এমনকি গালাগালি, হাতাহাতি মারামারি ও হতে পারে ।

তবে সময়ের পরিবর্তনে পাল্টে গেছে অনেক কিছুই ।আসলে সময় যখন পরিবর্তন হয় সঙ্গে সঙ্গে উপাচার গুলোরও পরিবর্তন হয় । আগে পাড়ায় পাপায় আড্ডা হতো,আড্ডা হতো ঘরে বসে, চায়ের দোকানে, কফি হাউসে এই প্রসঙ্গে মান্না দের "কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই " এই গানটি গুরুত্বপূর্ণ ।এখন সত‍্যিই কফি হাউসের আড্ডা নেই ।কেউ তেমন কফি হাউসে মুখোমুখি আড্ডা দিতে পছন্দ করে না । বিজ্ঞানের অগ্ৰগতির সাথে বাঙালির আড্ডায় এসেছে ভার্চুয়াল তথা ইন্টারনেট মাধ‍্যম । ব্লগ,ফেসবুক,ই-মেল সবোপরি 'চ‍্যাট' শব্দটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত । যে যেখানেই থাকুক না কেন ল‍্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে ঢুকে আত্মীয় পরিজনদের সাথে আড্ডায় মাতে তখন তার সময় কীভবে চলে যায় তা সে বুঝতেই পারে না । ভার্চুয়াল আড্ডার মাধ্যমে সবাই মুহুর্তের মধ্যেই দেশ থেকে দেশান্তরে,দূর-দূরান্তে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয় ।সব বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে থাকে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ।

কবি সাহ‍্যিতিকেরাও ভার্চুয়াল আড্ডায় নিয়মিত আড্ডা দেন । তাই পরিশেষে বলা যায় জীবকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে নিয়মিত আড্ডা হোক । পরিবারের সদস্যদের বন্ধন দৃঢ় করতে কমবেশি পারিবারিক আড্ডা হোক । ভালো মানুষের আড্ডা সমাজকে পরিশিলীত করে । তাই বাঙালিদের আড্ডা আব‍্যাহত রাখতে হবে। আড্ডার মাধ্যমে সাহিত্য-চর্চা, সংস্কৃতি-চর্চা, ইতিহাস-চর্চা ও মানবিক মুল‍্যবোধের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে । পরিশিলীত নির্মল আড্ডা আব‍্যাহত থাকলে হাজার বছরেও বাঙালি সমাজকে কোনো ভাবেই ঘুণে ধরবে না ।

ছবি - সম্পা সাহা























সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )

Friday, 12 June 2020

মনোনয়ন তালিকা



থায় আছে , বাঙালি তার জীবনের বেশির'ভাগ সমস্যা সমাধানের উপদেশ আড্ডার মাধমেই পেয়ে যায়। সারা পৃথিবীতে বাঙালি 'বিচক্ষণ' ও 'জ্ঞানী'  জাতি হিসেবে পরিচিত , যার পিছনে এই আড্ডার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই আড্ডা যে শুধু কফি হাউস বা পাড়ার রকে'ই সীমাবদ্ধ তা নয়। এর পরিধি শম্ভু'দার চায়ের দোকান থেকে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিন পর্যন্ত। এই আড্ডা'র থেকেই কত কবি , সাহিত্যিক , রাজনৈতিক নেতা পেয়েছেন নতুন দিশারী , পেয়েছেন নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার নব দিগন্তের সন্ধান। তাই বাঙালি জাতি হিসেবে আড্ডা'র ভূমিকা এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



"বাঙালির আড্ডা" প্রতিবেদনের লেখা আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের কাছে প্রচুর লেখা এসেছে। কোনও লেখাই এড়িয়ে যাওয়ার মতন নয়। তবুও তার মধ্যে থেকে আমাদের পছন্দের সেরা পাঁচটি লেখা নির্বাচিত  হল। লেখা প্রকাশ পাবে আগামিকাল।  লেখক'দের নাম নিন্মলিখিত -



১) শৌর্যদীপ সান্যাল
২) ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়
৩) ময়ূখ হালদার
৪) মনোনীতা চক্রবর্তী
৫) সম্পা সাহা

আপনাদের সকল'কে সাহিত্যের সন্ধানে'র পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।
ভালো থাকুন , ভালো লিখুন ।




সাহিত্যের সন্ধানে'র সাপ্তাহিক ব্লগ প্রতিবেদন
কৌশিক দে (সম্পাদক )
অমৃতা রায় চৌধুরী, সম্রাট দে , অসীম দাস ( সহ সম্পাদক মন্ডলী )